নাগা বাজারের ইতিহাস: কাতিলা বিলের সঙ্গে গড়ে ওঠা এক গ্রামীণ বানিজ্যকেন্দ্র
নাগা বাজার,
কিনুরমোড়, কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী
নাগা বাজারের ইতিহাস: কাতিলা বিলের সঙ্গে গড়ে ওঠা এক গ্রামীণ বানিজ্যকেন্দ্র
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার অন্তর্গত নাগা বাজার এক সময় ছিল একটি ছোট বাজারঘর; এখন এটি আশপাশের অন্তত ৮–১০টি গ্রামের মানুষের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। দীর্ঘ কয়েক দশক আগে এই এলাকার ভূপ্রকৃতি, কৃষি, নদী-খাল ও বিল—বিশেষ করে কাতিলা বিল—কে কেন্দ্র করেই বাজারটির জন্ম। বাজারটির নামকরণ, বিকাশ, সামাজিক-অর্থনৈতিক গুরুত্ব, এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা—সবই এই অঞ্চলের জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
১. নাগা বাজার নামের উৎপত্তি
গ্রামের মানুষ আজ ভালোবেসে উচ্চারণ করেন “নাগা বাজার” নামটি। অথচ এই নামের পেছনের কাহিনি অনেকেই জানেন না। এর সূচনা হয়েছিল এক সাধারণ পরিবার থেকে—মো. গাহের আলী মণ্ডল ও তার সহধর্মিণী মোসা. নাসিমা বেগমের পরিবার থেকে। গহের আলী মণ্ডলের জন্ম ১৯৪০ সালের ১লা জানুয়ারি, এক সাদামাটা কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ছিল অধ্যবসায়, সততা ও মানবিকতার অটল উপস্থিতি। অন্যদিকে নাসিমা বেগম কোমল হৃদয়ের, পরিশ্রমী ও পারিবারিক বন্ধনে বিশ্বাসী এক নারী। ১৯৭১ সালে এই দুই আত্মা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, এবং সেই সম্পর্কই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে “নাগা” নামের মূল অনুপ্রেরণা।
‘নাসিমা’ থেকে ‘না’ এবং ‘গাহের ’ থেকে ‘গা’—এই দুটি অংশ মিলে গঠিত হয় “নাগা” নামটি।
এই ছোট্ট নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক বিরাট ভালোবাসার প্রতীক—মা ও বাবার নামের মিলনে গঠিত এক অমলিন স্মৃতি।
২. নাগা বাজারের প্রাচীন অর্থনৈতিক ভিত্তি
নাগা বাজার মূলত গড়ে ওঠে—
- কাতিলা বিল
- স্থানীয় কৃষিকাজ
- গ্রামীণ বসতি
- নৌপথ
এই সবকিছু মিলিয়েই বাজারটি সময়ের সঙ্গে বড় হতে থাকে।
(খ) বিল থেকে পাওয়া দেশি মাছ ছিল স্বর্ণসম পণ্য
বিল, খাল ও ছোট জলাশয় থেকে পাওয়া দেশি মাছ—বিশেষ করে টাকি, বোয়াল, শোল, মাগুর, সিং, কই, চিংড়ি—অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং প্রতিদিন বাজারে বিক্রি হতো। বিলকেন্দ্রিক এই মাছ ব্যবসা বাজারের প্রাথমিক শক্তি হয়ে ওঠে।
৩. কাতিলা বিল ও নাগা বাজার—দুইয়ের সম্পর্ক
নাগা বাজারের প্রকৃত বিকাশ ঘটে কাতিলা বিল-এর কারণে। এই বিল—
- কৃষিজমিতে পানির সরবরাহ দিত
- ধানের ফলন বাড়াতে সাহায্য করত
- বিপুল পরিমাণ দেশি মাছ সরবরাহ করত
- গ্রামবাসীর আয়ের পথ তৈরি করত
- বাজারে ক্রেতা-ব্যবসায়ীর সমাবেশ ঘটাত
পরবর্তীকালে যখন বিলটি মৎস্যচাষের জন্য ব্যবহার শুরু হলো, নাগা বাজার হয়ে ওঠে মাছ বিক্রির কেন্দ্র।
প্রতিদিন কাতিলা বিল থেকে—
- রুই
- কাতলা
- চিতল
- সিলভার কার্প
- ঘাষি
- তেলাপিয়া
- পাঙাশ
—সহ নানা প্রজাতির মাছ নাগা বাজারে আসতে থাকে। ফলে বাজারের পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায়।
৪. জমিদার আমল ও নাগা বাজার
এক সময় এই এলাকা ছিল বিরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জিসহ বিভিন্ন জমিদার পরিবারের অধীনে। বিশেষ করে কাছের বিরকুটশা জমিদার বাড়ি ছিল প্রশাসনের কেন্দ্র। জমিদাররা—
- বাজারের নিরাপত্তা
- খাজনা আদায়
- হাটবাজর ব্যবস্থাপনা
- কৃষকদের সমস্যা সমাধান
এসব কাজ দেখভাল করত। ১৯৫৭ সালে জমিদার পরিবার কলকাতায় চলে যাওয়ার পর বাজারের দায়িত্ব স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারগুলোর হাতে চলে আসে, এবং তারা বাজারকে আরও বিস্তৃত করে।
৫. নাগা বাজারের আজকের চিত্র
বর্তমান সময় নাগা বাজার শুধু একটি গ্রামীণ বাজার নয়—এটি একটি কেন্দ্রীয়, ব্যস্ত বাণিজ্যিক হাব:
বাজারের প্রধান বিভাগসমূহ
- মাছের বাজার
- কাঁচাবাজার
- মুদি দোকান
- ফলের দোকান
- পোলট্রি দোকান
- কাপড় ও প্রসাধনী
- মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স
- চায়ের দোকান
- কৃষিজ সরঞ্জাম বিক্রয় কেন্দ্র
মাছই এখন প্রধান আকর্ষণ
প্রতি সকাল ও বিকেলে কাতিলা বিলের মাছ আসার সময় বাজারে ভিড় বাড়ে। অনেকেই শুধু তাজা মাছের জন্য এখানকার বাজারে আসেন।
৬. নাগা বাজারের সামাজিক গুরুত্ব
নাগা বাজার এখন—
- গ্রামের মানুষের মিলনস্থল
- সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র
- রাজনৈতিক আলাপ–আলোচনার স্থান
- পারিবারিক কেনাকাটার জায়গা
- উৎসব ও মৌসুমী হাটের কেন্দ্র
ঈদ, পূজা, নববর্ষ, শীতকালীন মৌসুম, পাট কাটার সময়—সবসময়ই বাজারে বিশেষ ভিড় লক্ষ করা যায়।
৭. ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা
নাগা বাজারের সামনে রয়েছে বহু সম্ভাবনা—
- স্থায়ী মাছের আড়ত গড়ে তোলা
- মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট
- কৃষি ও মৎস্য সহায়তা কেন্দ্র
- আরও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা
- কাতিলা বিলকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম
- বাজারের আধুনিকীকরণ
যদি এগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে নাগা বাজার ও কাতিলা বিল দুটোই উত্তরবঙ্গের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
৮. কাতিলা বিল + নাগা বাজার: একে অপরের পরিপূরক
সংক্ষেপে বললে—
কাতিলা বিল নাগা বাজারকে বাঁচিয়ে রেখেছে, আর নাগা বাজার কাতিলা বিলের মাছ ও কৃষিজ উৎপাদনের বাজার তৈরি করে দিয়েছে।
এ সম্পর্ক—
- অর্থনৈতিক
- সামাজিক
- ঐতিহাসিক
- সাংস্কৃতিক
- পরিবেশগত
সব দিক দিয়েই গভীর ও মূল্যবান।
উপসংহার
কাটিলা বিল ও নাগা বাজার—দুইটি শব্দ, কিন্তু একে অপরের পরিপূরক।
একটি প্রকৃতি, আরেকটি সমাজ।
একটি উৎপাদন, আরেকটি বাণিজ্য।
বিলের পানি যেমন দান করে মাছ, তেমনি বাজার প্রতিদিন সেই মাছ মানুষের ঘরে পৌঁছে দেয়। তিনটি গ্রামের সহমর্মিতা, মানুষের পরিশ্রম, প্রকৃতির দান এবং ঐতিহ্যের শক্তি—সব মিলিয়ে কাটিলা বিল এবং নাগা বাজার আজ বাগমারার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই দুইয়ের সম্মিলিত ইতিহাস শুধু অতীত নয়—এটি ভবিষ্যতেরও ভিত্তি।
