নাগা বাজারের উত্তরপাশে “নাগা বাজার গ্রামীণফোন টাওয়ার”: আধুনিক যোগাযোগের এক নতুন অধ্যায়
নাগা বাজার,
কিনুরমোড়, কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী
নাগা বাজারের উত্তর পাশে “নাগা বাজার গ্রামীণফোন টাওয়ার”: আধুনিক যোগাযোগের এক নতুন অধ্যায়
ভূমিকা
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে ডিজিটাল সংযোগ এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি এক মৌলিক চাহিদা। মোবাইল যোগাযোগের প্রসার আজ গ্রামীণ অর্থনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার যোগীপাড়া ইউনিয়নের কিনুরমোড়ের প্রাণকেন্দ্র “নাগা বাজার” দীর্ঘদিন ধরে এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি বড় ঘাটতি ছিল—বিশেষ করে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে 2022 সালে নাগা বাজার মৌলভীভিটা/মূলিভিটা সড়ক এর উত্তর পাশে, ডান দিকের উঁচু স্থানে, গ্রামীণফোন কোম্পানি একটি আধুনিক টাওয়ার স্থাপন করে। এই টাওয়ার স্থাপনের মাধ্যমে নাগা বাজার এবং আশপাশের গ্রামগুলো—গোপীনাথপুর, শান্তিপুর, বীরকুৎসা, বনগ্রাম ও কাতিলা—নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল যোগাযোগ এখন সহজলভ্য।
টাওয়ারটির অবস্থান:
নিচু কাতিলার হিন্দু পাড়ার শ্রী গোপাল চন্দ্র সরকার এর নির্ধারিত জায়গাতে অবস্থিত টাওয়ারটি।
টাওয়ার স্থাপনের পটভূমি
নাগা বাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল ছিল। বিশেষ করে বাজারের ভেতরে কিংবা গোপীনাথপুর ও কাতিলা গ্রামের অভ্যন্তরে ফোনে কথা বলার সময় কল ড্রপ, নেটওয়ার্ক না থাকা, কিংবা ইন্টারনেটের ধীর গতির কারণে মানুষকে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হতো।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করতেন, অনলাইন পেমেন্ট, বিকাশ, নগদ কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কাজ ঠিকমতো করা যাচ্ছিল না। শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস বা গুগল সার্চের সুবিধা পাচ্ছিল না। তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তা বা ডিজিটাল সার্ভিস প্রদানকারীরাও পিছিয়ে ছিলেন।
এই বাস্তবতা অনুধাবন করে, ২০২২ সালের দিকে গ্রামীণফোন কোম্পানি স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নাগা বাজারের উত্তর পাশে একটি নতুন টাওয়ার নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
2022 সালের মার্চ মাসে কাজ শুরু হয়, এবং একই বছরের আগস্ট মাসে টাওয়ারটির কার্যক্রম শুরু হয়।
টাওয়ারের অবস্থান ও কাঠামোগত বিবরণ
এই টাওয়ারটি নাগা বাজার মৌলভী ভিটা মূলিভিটা সড়ক এর ডান পাশে, উত্তর দিকে একটি তুলনামূলক উঁচু স্থানে স্থাপিত হয়েছে। স্থাপনের স্থানটি এমনভাবে নির্বাচন করা হয়েছে যাতে নাগা বাজারের কেন্দ্র থেকে শুরু করে গোপীনাথপুর, বীরকুটশা, শান্তিপুর, বনগ্রাম, কাতিলা ও আশপাশের অন্তত দশটি গ্রামের উপর সরাসরি নেটওয়ার্ক কভারেজ নিশ্চিত করা যায়।
টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় ২০০ ফুট, এবং এতে আধুনিক 4G ও 5G প্রস্তুত সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। টাওয়ারটির নিচে একটি ছোট কম্পাউন্ড, সোলার সিস্টেম দ্বারা চালিত বিদ্যুৎ ব্যাকআপ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার জন্য ২৪ ঘণ্টা পাহারাদার রাখা হয়েছে।
স্থানীয় মানুষ একে “নাগা বাজার টাওয়ার” নামেই চেনে, কারণ এটি বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত নাগা বাজার-মৌলভীভিটা /মূলিভিটা সড়ক এর ডান পাশে অবস্থিত।
স্থাপনের প্রভাব: যোগাযোগে বিপ্লব
গ্রামীণফোন টাওয়ার স্থাপনের পর নাগা বাজার এলাকায় যে পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা গেছে, তা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।
১️⃣ মোবাইল কল ও ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধি
আগে যেখানে মোবাইল কল প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, এখন সেখানে স্পষ্ট শব্দে কথা বলা যায়। ইন্টারনেটের গতি ৫ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন ইউটিউব দেখা, অনলাইন ক্লাস করা, ভিডিও কল করা কিংবা লাইভ স্ট্রিমিং—সবই সহজ হয়েছে।
২️⃣ ব্যবসায়িক উন্নয়ন
নাগা বাজারের দোকানদাররা এখন মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন অর্ডার ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সুবিধা নিচ্ছেন। গ্রামীণফোনের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কারণে ব্যবসায়ীরা বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায় অ্যাপ সহজে ব্যবহার করতে পারছেন।
উদাহরণস্বরূপ: মোঃহাসাদুল ইসলাম, শ্রী আভাস কুমার জুয়েল রানার দোকানে প্রতিদিন অনলাইন পেমেন্ট লেনদেন হয়। ফলে গ্রাহক ও বিক্রেতা উভয়েই আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন।
৩️⃣ শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ
বিদ্যালয় ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা এখন গুগল সার্চ, ইউটিউব টিউটোরিয়াল, অনলাইন ক্লাস ও ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্মে সহজে প্রবেশ করতে পারছে। করোনা পরবর্তী সময়ে অনলাইন শিক্ষার চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৪️⃣ প্রবাসী যোগাযোগে সহজতা
নাগা বাজার ও আশপাশের অনেক পরিবারের সদস্য প্রবাসে কর্মরত। আগে তাঁদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে নেটওয়ার্ক সমস্যায় ভুগতে হতো। এখন গ্রামীণফোনের এই নতুন টাওয়ার তাদের জন্য এক নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
৫️⃣ জরুরি সেবা ও নিরাপত্তা
এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এখন আর কোনো বাধা নেই। দুর্ঘটনা বা জরুরি অবস্থায় মানুষ দ্রুত সাহায্য চাইতে পারে, যা আগে খুবই কঠিন ছিল।
প্রযুক্তিগত দিক ও আধুনিকতা
গ্রামীণফোন কোম্পানি টাওয়ারটিতে নতুন প্রজন্মের অ্যান্টেনা সিস্টেম, LTE Advanced প্রযুক্তি, ও স্মার্ট পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট যুক্ত করেছে। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেও সোলার ব্যাকআপের মাধ্যমে টাওয়ার চলমান থাকে।
এছাড়া, টাওয়ারটি ভবিষ্যৎ 5G আপগ্রেডের জন্য প্রস্তুত—যার মাধ্যমে নাগা বাজার একদিন সরাসরি স্মার্ট গ্রাম বা স্মার্ট ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
পরিবেশগত দিক
টাওয়ার স্থাপনের সময় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর চারপাশে গাছ লাগানো হয়েছে, যাতে শব্দ ও রেডিও তরঙ্গের প্রভাব কমানো যায়।
স্থানীয় মানুষ প্রথমে কিছুটা শঙ্কিত ছিলেন—রেডিয়েশন বা পরিবেশ দূষণ নিয়ে। তবে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই টাওয়ার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্মিত, যা পরিবেশ ও মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়া
নাগা বাজারের দোকানদার, কৃষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এমনকি বৃদ্ধরাও এখন এই টাওয়ারের সুবিধা অনুভব করছেন।
- মোঃহাসাদুল ইসলাম (দোকানদার): “আগে বিকাশে টাকা পাঠাতে পারতাম না, কল ড্রপ হতো। এখন দোকানে বসেই গ্রাহকের বিকাশ ট্রান্সফার দিতে পারি।”
- শ্রী গোপাল চন্দ্র সরকার (শিক্ষক): “অনলাইন ক্লাস নিতে অনেক সুবিধা হচ্ছে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন গুগলে তথ্য খুঁজে শেখার চেষ্টা করছে।”
- ইদ্রিস আলী (কৃষক): “কৃষি অফিসের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা সহজ হয়েছে। আবহাওয়া আর বাজারদর জানতে এখন ফোনই ভরসা।”
এই টাওয়ার এখন নাগা বাজারবাসীর কাছে কেবল একটি প্রযুক্তিগত স্থাপনা নয়, বরং উন্নয়নের প্রতীক।
অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধারা
নেটওয়ার্ক উন্নত হওয়ার ফলে নাগা বাজারে এখন মোবাইল রিচার্জ, ইন্টারনেট ডেটা বিক্রয়, ও অনলাইন সার্ভিস কেন্দ্রগুলো বৃদ্ধি পেয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তারা এখন ছোট ছোট মোবাইল সার্ভিস দোকান খুলছেন, কেউ কেউ অনলাইন ব্যবসা শুরু করেছেন—যেমন পোশাক বিক্রি, ফুড ডেলিভারি বা ফেসবুক পেজ মার্কেটিং।
ডিজিটাল কানেকশন এখন অর্থনীতির চালিকা শক্তি হয়ে উঠছে। গ্রামীণফোনের এই টাওয়ার যেন সেই শক্তিকে মজবুত ভিত্তি দিয়েছে।
সামাজিক পরিবর্তন ও ডিজিটাল সচেতনতা
আগে মোবাইল ইন্টারনেট শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন গ্রামের নারীরাও অনলাইন ভিডিও, স্বাস্থ্য পরামর্শ ও শিক্ষামূলক কনটেন্টে যুক্ত হচ্ছেন।
মসজিদ, মন্দির, বিদ্যালয় ও বাজারের নানা অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞপ্তি এখন ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সহজে প্রচার করা যায়। ফলে নাগা বাজারের সামাজিক সংহতি ও তথ্যপ্রবাহ আরও গতিশীল হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যদিও টাওয়ারটি স্থাপনের মাধ্যমে বিপুল উন্নতি এসেছে, তারপরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:
- এখনও কিছু নিম্নাঞ্চল বা নদীপাড়ে নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকে।
- অনেকে স্মার্টফোন ব্যবহার জানেন না, ফলে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন।
- ইন্টারনেট খরচ কিছুটা বেশি হওয়ায় দরিদ্র মানুষ পুরোপুরি সুবিধা পাচ্ছে না।
তবে গ্রামীণফোন আগামীতে 5G সেবা চালু করলে এই সীমাবদ্ধতাগুলো অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করা যায়। স্থানীয় প্রশাসনও পরিকল্পনা করছে নাগা বাজারকে “ডিজিটাল স্মার্ট বাজার” হিসেবে গড়ে তোলার, যেখানে টাওয়ারের সুবিধা সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করা হবে।
নাগা বাজার-মৌলভীভিটা /মূলিভিটা রোডের উন্নয়ন ও টাওয়ারের ভূমিকা
টাওয়ার স্থাপনের পর নাগা বাজার রোডের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থী এই রাস্তায় চলাচল করে। নেটওয়ার্ক সুবিধা থাকায় রাস্তার পাশে এখন অনেকে অনলাইন ক্যাফে, মোবাইল রিপেয়ারিং দোকান ও ছোট ব্যবসা চালু করেছেন।
নাগা বাজার ব্রিজ, নাগা বাজার চত্বর এবং গোপীনাথপুর গ্রামের দিকে যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে, টাওয়ার সেটিকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।
টাওয়ারের সামাজিক প্রতীকী মূল্য
আজ নাগা বাজারের উত্তর পাশের এই টাওয়ার শুধু একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়—এটি আধুনিকতার প্রতীক। রাতের বেলায় টাওয়ারের লাল আলো জ্বলে ওঠে, দূর থেকে দেখা যায়—যেন নাগা বাজারের উন্নয়নের বাতিঘর।
মানুষ এখন এই টাওয়ারকে “আলো ও যোগাযোগের স্তম্ভ” বলে উল্লেখ করে। অনেকের কাছে এটি এক ধরনের গর্বের বিষয়—কারণ এটি নাগা বাজারের নামকে মানচিত্রে দৃশ্যমান করেছে।
উপসংহার
২০২৩ সালে নাগা বাজার রোডের উত্তর পাশে স্থাপিত গ্রামীণফোন টাওয়ার নাগা বাজারের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু একটি টাওয়ার নয়, বরং নাগা বাজারের জনগণের জীবনমান উন্নয়নের পথপ্রদর্শক।
এটি এনে দিয়েছে—
- উন্নত যোগাযোগ,
- আধুনিক শিক্ষা সুযোগ,
- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি,
- সামাজিক সংযোগ ও নিরাপত্তা।
আজ নাগা বাজার ও গোপীনাথপুর, কাতিলা, বনগ্রাম, শান্তিপুর, বীরকুটশা গ্রামের মানুষ একবাক্যে বলেন—
“এই টাওয়ার আমাদের জীবনে নতুন আলো এনেছে।”


