নাগা বাজারের পাশে কাতিলা সবুজ সংঘ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ: জনগণের আলোকবর্তিকা
https://maps.app.goo.gl/ufC2qFVaQeB5hVUJ6
কাতিলা সবুজ সংঘ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
নাগা বাজার,
কিনুরমোড়, কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী
বাংলাদেশের গ্রামীণ শিক্ষা, সমাজ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে দূর-দুরান্তের অবহেলিত, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয় একটি পরিবারের স্বপ্ন পাল্টে দেওয়ার জাদুকরী শক্তি রাখে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার নাগা বাজার—যা একটি ক্রমবর্ধমান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র—তার আশেপাশের মানুষের জীবনেও এমন আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। নাগা বাজারের পশ্চিম পাশে মাত্র ১৬০০ মিটার দূরে অবস্থিত কাতিলা সবুজ সংঘ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ আজ সেই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা, উন্নয়ন, সংগ্রাম ও মানুষের জীবনে এর বহুমাত্রিক প্রভাব সত্যিই উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে কাতিলা গ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং “এল-শেপড” বিস্তৃত গ্রাম এবং এর চারপাশের এলাকার মানুষ শিক্ষা-অভাব থেকে উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে আজও আশীর্বাদ হিসেবে দেখে।
প্রতিষ্ঠার সূচনা: এক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম
১৯৯০-এর দশক ছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ শিক্ষার কাঠামোতে পরিবর্তনের যুগ। এই সময়ে দেশের সমাজ, রাজনীতি ও প্রশাসনে উন্নয়নের নতুন ধারা শুরু হয়। এই পরিবর্তনের বাতাস কেবল শহরেই নয়, গ্রামেও পৌঁছে যায়। তৎকালীন রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাননীয় এমপি মরহুম আবু হেনা তখনকার সময়ে শিক্ষার প্রসারে দৃঢ়ভাবে কাজ করছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং শিক্ষার আলোক ছড়িয়ে দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প।
কাতিলা গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল—একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। নাগা বাজার ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাজার হলেও সেই অঞ্চলে উচ্চবিদ্যালয়ের অনুপস্থিতি শিশুদের জন্য একটি বড় বাধা। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারদের অনেকেই সন্তানদের দূরের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারতেন না; ফলে অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা ঝরে যেত।
এই পরিস্থিতি উপলব্ধি করে মাননীয় এমপি আবু হেনা কাতিলা গ্রামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেন। প্রথম নামকরণ করা হয় কাতিলা তাহমিনা উচ্চ বিদ্যালয়—যা ছিল তাঁর পরিবারের (মায়ের নাম )নামানুসারে এক সম্মানজনক উৎসর্গ।
নাম পরিবর্তন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি
বিদ্যালয় স্থাপন সহজ ছিল না। যদিও শুরুটা উদ্দীপনাময় ছিল, তবুও পরবর্তীতে স্কুলের এমপিও সমস্যার কারণে বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করতে হয়। নতুন নাম নেওয়া হলো—
কাতিলা সবুজ সংঘ উচ্চ বিদ্যালয়
এই নামটি নতুন উদ্দীপনা, নতুন পরিচয় ও নতুন পথচলার প্রতীক ছিল। “সবুজ সংঘ” নামের মধ্যে জাতীয় পরিচয়, পরিবেশ-সচেতনতা এবং তরুণদের বিকাশের এক সমন্বিত ভাবধারা ফুটে ওঠে। ফলে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হতে সক্ষম হয় এবং শিক্ষকদের বেতন ব্যবস্থা ও শিক্ষার মান উন্নত হয়।
বিদ্যালয় থেকে কলেজে বিস্তার: শিক্ষার দিগন্ত আরও উন্মুক্ত
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কিছু বছর পর দেখা যায়—মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা আবারও নতুন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। কারণ নিকটবর্তী এলাকায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের কোনো কলেজ ছিল না। কাতিলা, নাগা বাজার, নোখোপাড়া, পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহের শিক্ষার্থীরা ইন্টারমিডিয়েট পড়ার জন্য দূরে যেতে বাধ্য হতেন।
দরিদ্র পরিবারদের পক্ষে এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।
ফলে জনগণের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে, বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সিদ্ধান্ত নেন—বিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি কলেজ বিভাগ চালু করা হবে।
এভাবে জন্ম নেয়—
কাতিলা সবুজ সংঘ কলেজ
প্রথমে মানবিক শাখা চালু হলেও পরে বাণিজ্য ও অন্যান্য শাখা যোগ করা হয়। ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার পথ আরও প্রশস্ত হয়।
নাগা বাজারের কাছে অবস্থান: শিক্ষা ও বাণিজ্যের মিলিত প্রবাহ
বিদ্যালয় ও কলেজটি নাগা বাজারের পশ্চিম পাশে মাত্র ১৬০০ মিটার দূরে অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে এটি অত্যন্ত কৌশলগত স্থান, কারণ—
- নাগা বাজার এলাকাটি দ্রুত বর্ধনশীল বাণিজ্যকেন্দ্র
- কাতিলা গ্রাম অঞ্চলটির বৃহত্তম জনগোষ্ঠী
- পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষ প্রতিদিন নাগা বাজারে যাতায়াত করে
- খাদ্য, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহৃত
ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এমন একটি জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যেখান থেকে সর্বাধিক ছাত্রছাত্রী উপকৃত হতে পারে।
অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষার আলো
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোর সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ প্রদান করা। আর সত্যিই বিদ্যালয় ও কলেজটি এই লক্ষ্য পূরণ করেছে।
দরিদ্র পরিবারের ভরসা
অনেক পরিবার যারা সন্তানদের জামা, খাতা-কলম কিনতেও হিমশিম খেতেন, তারা যখন বহু কষ্টে সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতেন, তখন নতুন চিন্তা দেখা দিত—
“মাধ্যমিক পর্যায়ে কোথায় পড়াবো?”
কাতিলা সবুজ সংঘ উচ্চ বিদ্যালয় সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। নিকটবর্তী হওয়ায় যাতায়াত খরচ কমেছে। নদী-খাল পার হতে হয় না। সাইকেল, পায়ে হেঁটে বা অল্প ভাড়ায় রিকশায় পৌঁছানো যায়। ফলে পিতামাতারা নিশ্চিন্ত হয়ে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন।
মেয়েদের শিক্ষাবিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা
গ্রামের মেয়েদের পড়াশোনা অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের দূরত্ব মাত্র ১৬০০ মিটার হওয়ার কারণে অভিভাবকরা নিরাপদ মনে করেন। এর ফলে—
- মেয়েদের ভর্তি সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে
- মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাসের হার বেড়েছে
- অনেক মেয়ে পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে
এই অর্জন কেবল এক গ্রামের নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য অনুপ্রেরণার।
শিক্ষকদের ভূমিকা: ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকরা শুধু পাঠদানই করেননি—তারা ছাত্রছাত্রীদের নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব, দেশপ্রেম এবং জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
শিক্ষকরা—
- দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ সহায়তা
- বিনামূল্যে কোচিং
- সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম
- সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি
এভাবে একটি সম্পূর্ণ মানস গঠনমূলক শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করেছেন।
কাতিলা গ্রাম ও নাগা বাজার: জ্ঞানচর্চার দুই প্রধান কেন্দ্র
কাতিলা গ্রাম ও নাগা বাজার আগে শুধুই কৃষি, বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এই দুটি জায়গার পরিচয় পাল্টে যায়।
জ্ঞান ও সভ্যতার কেন্দ্র
এখন মানুষ বলে—
“পড়াশোনার জন্য কাতিলা -নাগা বাজারই সেরা।”
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর গ্রামে—
- কেরানি, শিক্ষক, পুলিশ, সেনাকর্মী
- ব্যবসায়ী
- সরকারি কর্মচারী
- চিকিৎসক
- প্রবাসী
- প্রযুক্তিবিদ
এদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। কারণ শিক্ষাই তাদের সেই দরজা খুলে দিয়েছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন
বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় মানুষের জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে তা উল্লেখযোগ্য:
১. শিক্ষার হার বৃদ্ধি
কাতিলা, নাগা বাজার ও আশেপাশের গ্রামে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। বহু পরিবারে প্রথমবারের মতো উচ্চ মাধ্যমিক পাস শিক্ষার্থীর জন্ম হয়েছে।
২. নারীর ক্ষমতায়ন
মেয়েদের শিক্ষাপ্রাপ্তি বেড়ে যাওয়ায় তাদের সামাজিক অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।
৩. চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি
শিক্ষিত যুবকদের চাকরির সুযোগ ও কর্মদক্ষতা উন্নত হয়েছে।
৪. বাল্যবিয়ের হার কমেছে
মেয়েরা বিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যয়ন করার কারণে বাল্যবিবাহের ঘটনা হ্রাস পেয়েছে।
৫. সাংস্কৃতিক উন্নতি
স্কাউট, ক্রীড়া, কবিতা, বিতর্ক সভা, বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান—এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ হচ্ছে।
৬. গ্রামীণ অর্থনীতি সক্রিয় হয়েছে
বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে দোকান, রিকশা, স্টেশনারি, কোচিং সেন্টার—এসব গড়ে ওঠে।
সমাজে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব
জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মানুষের মিলিত প্রয়াস
এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে স্থানীয় মানুষ, অভিভাবক, শিক্ষক, সাবেক ছাত্র, জনপ্রতিনিধি সবাই মিলে কাজ করেছেন।
মানুষের কৃতজ্ঞতা
কেউই ভুলে না—
মরহুম এমপি আবু হেনা না থাকলে এই বিদ্যালয় ও কলেজ আজও হয়তো গড়ে উঠত না।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
কাতিলা সবুজ সংঘ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ সামনে আরও উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে:
- ডিজিটাল ক্লাসরুম
- কম্পিউটার ল্যাব
- বিজ্ঞানাগার আরও সমৃদ্ধ করা
- লাইব্রেরি সম্প্রসারণ
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ
- প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা
- কারিগরি শিক্ষার শাখা
- নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পৃথক ভবন
যদি এসব বাস্তবায়ন হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি আরও সফল হবে।
শেষ কথা
কাতিলা সবুজ সংঘ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ আজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি কাতিলা গ্রাম, নাগা বাজার এবং আশেপাশের মানুষের আশার প্রতীক। ১৯৯০-এর দশকে প্রতিষ্ঠার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত এটি হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিয়েছে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের হাতে কলম তুলে দিয়ে স্বপ্ন দেখিয়েছে—
“শিক্ষাই উন্নতির একমাত্র পথ।”
এভাবে কাতিলা গ্রাম ও নাগা বাজার আজ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার এক কর্ণধার কেন্দ্র, যা পরবর্তী প্রজন্মকে আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।


marijuana edibles shipping fast across usa and globally