নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা গাহের আলী মন্ডল: পরিচিতি (পর্ব–৩)
নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা গাহের আলী মন্ডল: একটি অনুপ্রেরণা
বাংলার গ্রামীণ সমাজে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের পরিচয় শুধু একটি নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—তারা হয়ে ওঠেন একটি ইতিহাস, একটি অনুপ্রেরণা। নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম গাহের আলী মন্ডল ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তার জীবন ছিল সরলতার এক অনন্য উদাহরণ, আর তার ব্যক্তিত্ব ছিল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। এই “পরিচিতি (পর্ব–৩)” তে আমরা তুলে ধরছি তার জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা তাকে আমাদের কাছে আরও শ্রদ্ধেয় করে তোলে।
গাহের আলী মন্ডল ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল জীবনযাপনের মানুষ। তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না, কোনো দম্ভ ছিল না। সমাজে তিনি ছিলেন পরিচিত এবং সম্মানিত, কিন্তু সেই সম্মান তাকে কখনোই গর্বিত করেনি। বরং তিনি ছিলেন সবার জন্য উন্মুক্ত—ধনী-গরিব, ছোট-বড়, সকলের সঙ্গে তিনি একই রকম আন্তরিকতায় কথা বলতেন। এই গুণই তাকে সমাজের প্রতিটি স্তরে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
তার পরিচিতির পরিধি ছিল বিস্তৃত। সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি কখনো সেই পরিচিতিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেননি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়া উচিত আন্তরিকতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে। তার এই নীতিবোধই তাকে সবার কাছে আলাদা করে তুলেছিল।
গাহের আলী মন্ডল দীর্ঘদিন ধরে অ্যাজমা রোগে ভুগছিলেন। তবে এই রোগ তাকে কখনো দুর্বল করে দেয়নি। তিনি তার দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে গেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। জীবনের প্রতিটি বাধা তিনি ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। তার এই মানসিক শক্তি ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তার জীবনে একটি বড় ধাক্কা আসে। তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শয্যাশায়ী হয়ে যান। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো তিনি আর আমাদের মাঝে থাকবেন না। কিন্তু মহান আল্লাহ তাকে আরও কিছু সময় দান করেন। সেই সময়টা ছিল যেন তার জীবনের এক অতিরিক্ত অধ্যায়—যেখানে তিনি ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
এই সময়ের পর থেকে তিনি আর আগের মতো বাইরে যেতে পারতেন না। তার প্রিয় সঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগও কমে যায়। একজন প্রাণবন্ত মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন। তবুও তার মনোবল ছিল অটুট, আর তার স্বপ্ন ছিল অমলিন।
২০২৬ সালের ১৭ মার্চ ছিল তার জীবনের একটি বিশেষ দিন। সেদিন তিনি দীর্ঘদিন পর ঘর থেকে বের হয়ে একটি চায়ের দোকানে যান এবং এক কাপ চা পান করেন। এটি ছিল তার জীবনের শেষবারের মতো বাইরে যাওয়া এবং মানুষের সঙ্গে দেখা করা। হয়তো তিনি তখনও জানতেন না, এই দিনটিই তার জীবনের শেষ বাহিরে কাটানো মুহূর্ত হয়ে থাকবে। কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনাটি আজ আমাদের কাছে এক গভীর স্মৃতি হয়ে রয়েছে।
এরপরের সময়টা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ১৭ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ—মাত্র সাত দিনের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণভাবে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এই সাত দিন যেন তার জীবনের শেষ অধ্যায়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা। পরিবার ও কাছের মানুষদের উপস্থিতিতে তিনি ধীরে ধীরে বিদায়ের প্রস্তুতি নেন।
অবশেষে ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ, বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা হারিয়েছি একজন সাহসী মানুষ, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন পথপ্রদর্শককে।
নাগা বাজার প্রতিষ্ঠা ছিল তার জীবনের একটি বড় স্বপ্ন। তিনি এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে অনেক কাজ শুরু করেছিলেন। তার চিন্তা ছিল, এই বাজার একদিন এলাকার মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে—যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক যোগাযোগ এবং উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।
যদিও তিনি তার স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি, তবে তিনি যে বীজ বপন করে গেছেন, তা আজও বেঁচে আছে। তার সেই স্বপ্ন এখন বহন করছেন তার দুই পুত্র—মোঃ আব্দুল আলীম এবং মোঃ গোলাম মোস্তফা। তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, তাদের পিতার অসমাপ্ত কাজ তারা সম্পূর্ণ করবেন এবং নাগা বাজারকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেবেন।
গাহের আলী মন্ডলের জীবন আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন মানুষ বড় হতে হলে ধন-সম্পদ নয়, প্রয়োজন একটি ভালো মন, একটি সৎ চিন্তা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের অনুপ্রাণিত করে, আমাদের পথ দেখায়।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার স্মৃতি, তার আদর্শ এবং তার স্বপ্ন আমাদের সঙ্গে রয়েছে। নাগা বাজারের প্রতিটি ইট-পাথরে, প্রতিটি মানুষের মনে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা বলি—আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
সৌজন্যে,
নাগা বাজার,কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী।
Naga Bazar,নাগা বাজার
https://maps.app.goo.gl/9en8otgA9CCs4udi6
Naga Bazar Zero Point
https://maps.app.goo.gl/XB2mNtt5Pj2nJpco9
Naga Vila