কাতিলা গ্রামের দুই প্রাথমিক বিদ্যালয় (নাগা বাজারসংলগ্ন):
নাগা বাজার,
কিনুরমোড়, কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী
কাতিলা গ্রামের দুই প্রাথমিক বিদ্যালয় (নাগা বাজারসংলগ্ন):
আলোর দিশারী
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ও জনবহুল একটি গ্রাম হলো কাতিলা । এই গ্রামটি আকারে যেমন বড়, তেমনি এর ভৌগোলিক গঠনও বেশ ব্যতিক্রমী। পুরো গ্রামটি ইংরেজি বর্ণ “L”-এর মতো আকার নিয়ে বিস্তৃত—দক্ষিণ দিক থেকে পশ্চিমে এবং তারপর উত্তরে বাঁক নিয়ে দীর্ঘ পরিসরে ছড়িয়ে আছে। কাটিলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি কেন্দ্র হলো নাগা বাজার, যা বহু বছর ধরে এলাকার মানুষের বাণিজ্যিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই বৃহৎ গ্রামের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যাদের অবস্থান, ইতিহাস, অবদান এবং উন্নয়ন এই গ্রামের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
এই দুই বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি অবস্থিত নাগা বাজারের পশ্চিম পাশে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে বাগপাড়া নামক স্থানে । অপরটি অবস্থিত নাগা বাজার থেকে উত্তরের দিকে প্রায় ১২০০ মিটার দূরে মৌলভীভিটা নামক খানের ঠিক সামান্য উত্তর দিকে অবস্থিত । পশ্চিম পাশের বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আগেই, আর উত্তরপাশের বিদ্যালয়টির জন্ম ১৯৯০-এর দশকে। সময়ের ব্যবধানে উভয় বিদ্যালয়ই কাটিলা গ্রামের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।
নিচে এই দুটি বিদ্যালয়ের ইতিহাস, অবদান, বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হলো।
প্রথম অধ্যায়: কাতিলা গ্রামের ভৌগোলিক কাঠামো ও নাগা বাজারের গুরুত্ব
কাতিলা গ্রামটি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার অন্যতম প্রাচীন ও উন্নয়নশীল গ্রাম। গ্রামের আকৃতি “L” বর্ণের মতো হওয়ায় এটি দুই দিক থেকে বিস্তৃত। দক্ষিণ–পশ্চিম অংশটি অধিক ঘনবসতিপূর্ণ, যেখানে নাগা বাজারই হলো কেন্দ্রীয় স্থান। এখান থেকে দৈনন্দিন বাজার, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা সেবার সমন্বয় ঘটে।
নাগা বাজার থেকে পশ্চিম দিকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত। এই পাশটিতে আগে কৃষি জমি ও ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা ছিল। অপরদিকে উত্তরের দিকে প্রায় ১২০০ মিটার দূরেও রয়েছে আরেকটি বিদ্যালয়, যার অবস্থান কিছুটা উঁচু-নিচু জমির পাশ ঘেঁষে। উত্তরের অংশে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে শিক্ষার চাহিদা তীব্রতর হয়, ফলে ১৯৯০–এর দশকে নতুন বিদ্যালয় স্থাপিত হয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়: পশ্চিম পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়—ইতিহাসের সাক্ষী
নাগা বাজারের পশ্চিমে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে যে বিদ্যালয়টি অবস্থিত, সেটি মুক্তিযুদ্ধের আগে প্রতিষ্ঠিত। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কিছু সমাজসেবী ব্যক্তি, জমিদার এবং গ্রামের প্রভাবশালী পরিবার একত্রিত হয়ে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন কাতিলা গ্রামে শিক্ষার অবস্থা খুবই দুর্বল ছিল। অধিকাংশ মানুষ চাষাবাদ ও প্রথাগত জীবনে ব্যস্ত থাকায় পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ কম ছিল।
প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য
- গ্রামের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা
- সমাজে অশিক্ষার হার কমানো
- নাগা বাজারকে শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থল বানানো
বিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায়
শুরুর দিকে বিদ্যালয়টি ছিল টিনসেড, মাটির ফ্লোর আর বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি। ছাত্রসংখ্যা তখন মাত্র ৪০–৫০ জন ছিল। শিক্ষকের সংখ্যা ছিল দুইজন। তবুও শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতি তাদের উৎসাহ ছিল অসীম।
সময়ের পরিবর্তন
মুক্তিযুদ্ধের পর সরকারি সহযোগিতা ও স্থানীয় মানুষের ভূমিকার কারণে বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
বর্তমানে—
- পাকা ভবন
- পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ
- প্রশিক্ষিত শিক্ষক
- খেলার মাঠ
- পানি ও স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন সুবিধা
এগুলো যুক্ত হওয়ায় এখন এটি একটি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বিদ্যালয়ের অবদান
এই বিদ্যালয়টি থেকে বহু ছাত্রছাত্রী আজ উচ্চশিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, প্রবাসী কর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় সুনাম অর্জন করেছেন। বিশেষ করে নাগা বাজার ও পশ্চিম পাশের পরিবারগুলোর শিশুদের শিক্ষার প্রধান ভরসা ছিল এই বিদ্যালয়।
তৃতীয় অধ্যায়: উত্তরের প্রাথমিক বিদ্যালয়—৯০ দশকের উন্নয়ন ও নতুন দিগন্ত
গ্রামের উত্তর পাশের জনসংখ্যা ১৯৮০–৯০ দশকে দ্রুত বেড়ে যায়। আগে ছোট ছোট ছড়ান–বসতি থাকলেও পরে সেখানে বড় পরিবার, নতুন বাড়িঘর, বাজারঘর, মসজিদ-মক্তব ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটে। সেই সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে ওঠে।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
মাননীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম্য নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় জনগণের দাবি অনুযায়ী ১৯৯০-এর দশকে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার সময় স্থানীয় যুবকদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তারা জমি সংগ্রহ, নির্মাণকাজে শ্রমদান, শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানোসহ নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা
বিগত ত্রিশ বছর ধরে এই বিদ্যালয়টি উত্তরের শিশুদের শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
এখানে—
- বৃহৎ ভবন
- পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ
- খেলার মাঠ
- প্রশিক্ষিত শিক্ষক
- সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
সবই রয়েছে।
উত্তরের বিদ্যালয়ের বিশেষ অবদান
উত্তরের বিস্তৃত এলাকায় আগে মেয়েদের স্কুলে যাতায়াত করা কঠিন ছিল। এই বিদ্যালয় স্থাপনের ফলে:
- মেয়েদের স্কুলে ভর্তি হার বাড়ে
- ড্রপআউট কমে
- স্থানীয় শিক্ষিত পরিবার দ্বিগুণ বেড়ে যায়
এই বিদ্যালয়টি আজ উত্তর কাটিলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সচেতনতার প্রধান চালিকা শক্তি।
চতুর্থ অধ্যায়: দুই বিদ্যালয়ের মিলিত অবদান—শিক্ষার আলোয় আলোকিত কাটিলা
কাতিলা গ্রামের আকার বড় হওয়ায় একটি বিদ্যালয় দিয়ে পুরো গ্রামকে কাভার করা ছিল অসম্ভব। কিন্তু পশ্চিম ও উত্তর—এই দুই পাশের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে পুরো গ্রামই শিক্ষায় স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।
জনগণের ওপর প্রভাব
- অশিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে
- পরিবারগুলো এখন শিক্ষা–সচেতন
- হাতের মুঠোয় ডিজিটাল শিক্ষা পৌঁছে গেছে
- শিশুশিক্ষার ভিত মজবুত হয়েছে
নাগা বাজার ও আশপাশে শিক্ষার প্রসার
নাগা বাজারে প্রতিদিন ব্যবসা, বেচাকেনা ও সামাজিক কাজে আসা লোকেরা দুই বিদ্যালয়ের প্রভাব খুব কাছ থেকে অনুভব করেন।
আজ অনেক দোকানদার, ব্যবসায়ী, মাঝবয়সী ও তরুণরা এই বিদ্যালয়গুলো থেকেই শিক্ষার প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন।
উচ্চশিক্ষায় উৎসাহ বৃদ্ধি
দুই বিদ্যালয় থেকেই প্রতিবছর বহু ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হয়। অনেকে রাজশাহী শহরের সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও সুযোগ পেয়ে উৎকর্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে।
পঞ্চম অধ্যায়: কাতিলা গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণে বিদ্যালয় দুটির ভূমিকা
১. সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি, গান, নাচ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মকাণ্ড ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিত্ববিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখে।
২. ছেলেমেয়েদের সামাজিক আচরণ ও মূল্যবোধ গঠন
শিক্ষকেরা শুধুমাত্র পাঠ্যক্রম নয়, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করেন।
৩. গ্রামের ঐক্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি
বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে অভিভাবকদের সমাগম, কমিটি গঠন, মিলনমেলা, সভা-সমাবেশ—এসবের মাধ্যমে গ্রামের সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়: চ্যালেঞ্জ, সমস্যা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যদিও দুই বিদ্যালয়ই উন্নতির পথে রয়েছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান।
প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো
- কিছু শ্রেণিকক্ষের জায়গা এখনো সংকুচিত
- খেলার উপকরণ বাড়ানোর প্রয়োজন
- শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যদি সরকারি সহযোগিতা ও স্থানীয় মানুষের সমর্থন বাড়ে তাহলে—
- বিদ্যালয় দুটিতে স্মার্ট ক্লাসরুম হবে
- লাইব্রেরি আরও সমৃদ্ধ হবে
- সাংস্কৃতিক চর্চা আরও সম্প্রসারিত হবে
- শিক্ষার্থীদের মান আরও উন্নত হবে
সপ্তম অধ্যায়: উপসংহার—দুটি বিদ্যালয়ই কাটিলার উন্নয়নের ভিত্তি
কাতিলা গ্রামের মানুষের উন্নয়ন, সচেতনতা, সামাজিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক উন্নতির মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। আর এই শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছে গ্রামের দুই প্রাথমিক বিদ্যালয়। মুক্তিযুদ্ধের আগের বিদ্যালয়টি যেমন ইতিহাসের সাক্ষী, তেমনি ১৯৯০ দশকের বিদ্যালয়টি আধুনিক সময়ের দাবি পূরণ করছে।
আজ কাতিলা গ্রাম, নাগা বাজার ও আশপাশের অঞ্চলের উন্নয়নের পেছনে এই দুই বিদ্যালয়ের অবদান অস্বীকার করার মতো নয়। ভবিষ্যতেও এই বিদ্যালয়গুলো হবে আগামী প্রজন্মের আলোকবর্তিকা।


