নাগা বাজারের আশেপাশের নদী, খাল ও বিলভূমি: ইরি ধান চাষ ও মিঠাপানির মাছের আধার
রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার কাতিলা গ্রামের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত নাগা বাজার। এই বাজারটি শুধু স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণ নয়, বরং এটি ঘিরে থাকা প্রকৃতি, নদী, খাল ও বিলের সমাহারে একটি অনন্য ভৌগোলিক অঞ্চল। নাগা বাজারের চারপাশে রয়েছে অত্রাই নদী, ফকিন্নি নদী, বারনই নদী, কাতিলা খাল, ভাগনদী খাল, ভোঁটখালী খাল, কুচামারা খালসহ অসংখ্য জলাধার ও নিম্নভূমি। এইসব নদী ও খালের সঙ্গে সংযুক্ত আছে বিখ্যাত হালতির বিল, হাঁচার বিল ও ভাতারমারী বিল, যেগুলো বর্ষাকাল ও শুষ্ক মৌসুমে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে এবং স্থানীয় জনগণের জীবিকা ও সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে জড়িত।
নদীসমূহ: নাগা বাজারের প্রাণপ্রবাহ
১. অত্রাই নদী
অত্রাই নদী এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদী। এটি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্থানীয় কৃষি ও মৎস্যচাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্ষার সময়ে অত্রাই নদীর জলধারা হালতির বিল, হাঁচার বিল এবং ভাতারমারী বিলের সঙ্গে মিশে বিশাল জলাভূমি তৈরি করে। এই জলাশয়গুলোতে তখন নানান প্রজাতির দেশি মাছ যেমন শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, রুই, কাতলা, মৃগেল, পুঁটি, টাকি, চিংড়ি প্রভৃতি দেখা যায়।
অত্রাই নদীর জল এই এলাকার সেচ ব্যবস্থার জন্যও অপরিহার্য। ইরি ধান চাষের সময় অত্রাই নদী থেকে পানি উত্তোলন করে বিভিন্ন খালের মাধ্যমে ধানক্ষেতে সরবরাহ করা হয়। ফলে নাগা বাজার এলাকার কৃষকরা বছরের দুই মৌসুমেই ফলনশীল ধান উৎপাদন করতে পারেন।
২. ফকিন্নি নদী
ফকিন্নি নদী তুলনামূলক ছোট হলেও এটি স্থানীয় জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি বর্ষাকালে হালতির বিল ও ভাতারমারী বিলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশাল জলাধার তৈরি করে। মাছ ধরার মৌসুমে এই নদীতে নৌকা ভরে মাছ ধরা পড়ে। ফকিন্নি নদীর পাড়ে অনেক গ্রামবাসী মৌসুমি চাষ করেন—বিশেষ করে শীতকালে এই নদীর পাড়ে বেগুন, টমেটো, মরিচ ও পেঁয়াজের চাষ দেখা যায়।
৩. বারনই নদী
বারনই নদী রাজশাহীর পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাগমারা ও নাটোর জেলার একটি বড় অংশে সেচ সুবিধা দেয়। নাগা বাজার থেকে প্রায় কয়েক কিলোমিটার দূরে এই নদী প্রবাহিত হলেও এর প্রভাব পুরো অঞ্চলে ব্যাপক। বারনই নদীর জলধারা স্থানীয় খালগুলোর মাধ্যমে হালতির বিল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা শুষ্ক মৌসুমে ইরি ধানের জন্য সেচের জল সরবরাহ করে।
খালসমূহ: কৃষি ও জলের সংযোগসূত্র
১. কাতিলা খাল
নাগা বাজার সংলগ্ন কাতিলা খাল মূলত অত্রাই নদীর একটি শাখা ধারা। এটি গ্রামীণ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কাতিলা খালের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ও নদীর অতিরিক্ত জল বিল ও ধানক্ষেতে প্রবাহিত হয়। বর্ষার পর যখন জল ধীরে ধীরে কমে আসে, তখন খালের ধারে ধান চাষের পাশাপাশি সবজি চাষও হয়।
২. ভাগনদী খাল
ভাগনদী খালটি স্থানীয়দের জন্য প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। বর্ষাকালে এটি জলাধার হিসেবে রূপ নেয়, আবার শীতে শুকিয়ে গেলে এই খালের তলদেশে ইরি ধান চাষ হয়। কৃষকরা “চরে ধান” বা “চর ইরি” নামে পরিচিত এই চাষ পদ্ধতি থেকে ভালো ফলন পান।
৩. ভোঁটখালী খাল
ভোঁটখালী খাল নাগা বাজার থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে কুচামারা খালের সঙ্গে মিলিত হয়। এটি মৎস্যজীবীদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। বর্ষার মৌসুমে এই খালে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যায়, যা নাগা বাজারের মাছের আড়তগুলোতে সরবরাহ হয়। স্থানীয়রা এখানে “বাঁশের ফাঁদ” ও “চরা জাল” ব্যবহার করে মাছ ধরেন।
৪. কুচামারা খাল
কুচামারা খাল এলাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়। এই খাল বর্ষায় জল ধারণ করে রাখে এবং শীতে ইরি ধান চাষে পানি সরবরাহ করে। এছাড়াও কুচামারা খালের দুই পাড়ে রয়েছে উর্বর জমি, যেখানে পাট, সরিষা, শাকসবজি ও গমের চাষ হয়।
বিলসমূহ: প্রাকৃতিক জলাধার ও মাছের আধার
১. হালতির বিল
নাগা বাজার থেকে প্রায় 5 কিলোমিটার পূর্ব দিকে অবস্থিত হালতির বিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিল। বর্ষার সময় বিলটি প্রায় ৪-৫ কিলোমিটার বিস্তৃত হয়ে যায়। তখন এটি পরিণত হয় এক বিশাল মিঠাপানির মাছের ভান্ডারে। স্থানীয় জেলেরা হালতির বিল থেকে প্রচুর রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, টাকি, বেলে, চিংড়ি প্রভৃতি মাছ ধরেন।
শীতকালে যখন বিলের পানি শুকাতে থাকে, তখন কৃষকরা বিলের জমি ব্যবহার করে ইরি ধান চাষ করেন। বিলের মাটিতে জৈব উপাদান বেশি থাকায় ধানের ফলনও হয় অসাধারণ।
২. হাঁচার বিল
হালতির বিলের দক্ষিণে অবস্থিত হাঁচার বিল আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও এর জৈব বৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই বিলে বর্ষার সময় প্রচুর জলজ উদ্ভিদ জন্মে এবং নানা প্রজাতির পাখি আশ্রয় নেয়। স্থানীয়রা বলেন, হাঁচার বিল এক সময় পরিযায়ী পাখির আস্তানা ছিল। এখনো শীতের সকালে এখানে ভোরের কুয়াশায় হাঁস, বক, পানকৌড়ি, ডাহুক ইত্যাদি দেখা যায়।
৩. ভাতারমারী বিল
নাগা বাজারের প্রান্তে অবস্থিত ভাতারমারী বিল কৃষি ও মাছ দুইয়েরই সমন্বয়। বর্ষায় এটি মাছ ধরার জায়গা, আর শীতে ধান চাষের ক্ষেত। এখানকার মাটি অত্রাই নদীর পলি জমে তৈরি হওয়ায় অত্যন্ত উর্বর। ইরি ধানের পাশাপাশি এই বিলে অনেকেই মাছ চাষ করেন—বিশেষ করে পোনা মাছ ফেলার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে উৎপাদন বাড়ানো হয়।
ইরি ধান চাষ: অর্থনীতির মূল স্তম্ভ
নাগা বাজার ও আশেপাশের এই নদী-বিল অঞ্চল ইরি ধান চাষের জন্য বিখ্যাত। বর্ষার পর যখন নদী ও খালের পানি ধীরে ধীরে নেমে যায়, তখন এই নিম্নভূমিগুলো শুকিয়ে উর্বর ফসলভূমিতে পরিণত হয়।
ইরি ধান সাধারণত নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রোপণ করা হয় এবং এপ্রিল-মে মাসে কাটা হয়। কৃষকরা নদীর জল ও ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করে সেচ দেন। স্থানীয় কৃষকেরা বলেন—“এই বিলের ধান সোনার মতো ঝরে।”
এলাকার জনপ্রিয় ইরি জাতের ধান হলো ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-৮১ ও হাইব্রিড ধান। প্রতি হেক্টরে প্রায় ৬–৭ টন পর্যন্ত ধান উৎপাদন হয়। কৃষকরা এই ধান বিক্রি করে নাগা বাজারে তাদের দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহ করেন। বাজারের ধান ও চালের ব্যবসা পুরো বাগমারা উপজেলার অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করেছে।
মাছ ও জীববৈচিত্র্য
নাগা বাজার এলাকার নদী, খাল ও বিলগুলো শুধু কৃষির উৎস নয়, বরং মিঠাপানির মাছের এক প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। বিলের মাছ নাগা বাজারে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিক্রি হয়।
মৌসুমভেদে এখানে পাওয়া যায়—
- রুই, কাতলা, মৃগেল
- শিং, মাগুর, কৈ
- টাকি, চিংড়ি, পুঁটি
- সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, কালবাউস
- দেশি ছোট মাছ যেমন ছিপই, গুঞ্জা, বেলে ইত্যাদি
স্থানীয় জেলেরা বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে মাছ ধরে যেমন—চরা জাল, চায়না দোয়েল জাল, বঁড়শি, কোচ, খোড়া, বাশের ফাঁদ ইত্যাদি।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাগা বাজার অঞ্চলের এই নদী ও বিল ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খালগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে, নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে, আর বিলে আগাছা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি জমে প্লাবন ঘটে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানির ঘাটতি দেখা দেয়।
এছাড়াও অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বিলের প্রাকৃতিক মাছের প্রজাতি হ্রাস পাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মাঝে খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিচ্ছে, যা এই অঞ্চলের টেকসই কৃষি ও মৎস্যচাষের জন্য অপরিহার্য।
নাগা বাজারের ভূমিকা
নাগা বাজার হলো এই সমগ্র নদী-বিল অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রতিদিন সকালে কাতিলা খালের তীরবর্তী এলাকা থেকে কৃষক ও জেলেরা মাছ, ধান, শাকসবজি নিয়ে বাজারে আসেন। এখানকার মাছের বাজার রাজশাহী জেলার অন্যতম সক্রিয় মৎস্যবাজার হিসেবে পরিচিত।
ইরি ধানের মৌসুমে নাগা বাজারে চালকলগুলো ব্যস্ত সময় পার করে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ধান এখানেই প্রক্রিয়াজাত হয়ে রাজশাহী শহরসহ পার্শ্ববর্তী উপজেলা যেমন বাগমারা, দুর্গাপুর, তানোরে বিক্রি হয়।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যদি নদী, খাল ও বিলগুলোর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে করা যায়, তবে নাগা বাজারের আশেপাশের অঞ্চল রাজশাহীর অন্যতম কৃষি ও মৎস্য সম্পদভাণ্ডারে পরিণত হতে পারে। সরকার ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে নিম্নলিখিত উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে—
- খাল ও বিলের নিয়মিত খনন ও পরিষ্কার অভিযান।
- অত্রাই নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও তীরসংরক্ষণ।
- মাছের প্রজনন মৌসুমে জাল নিষিদ্ধকরণ।
- কৃষিতে কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব পদ্ধতি ব্যবহার।
- আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ও কৃষি প্রশিক্ষণের প্রসার।
উপসংহার
নাগা বাজারের আশেপাশের নদী, খাল ও বিল শুধু ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়, এটি এখানকার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি। অত্রাই, ফকিন্নি ও বারনই নদী; কাতিলা, ভাগনদী, ভোঁটখালী ও কুচামারা খাল; এবং হালতির বিল, হাঁচার বিল, ভাতারমারী বিল—এই সব জলাশয় মিলে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলেছে।
এই জলজ পৃথিবীর উপর নির্ভর করে হাজারো মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে, ইরি ধান ফলাচ্ছে, মাছ ধরছে, ও নাগা বাজারের আর্থসামাজিক কাঠামোকে সমৃদ্ধ করছে। প্রকৃতির এই উপহার যদি সংরক্ষণ করা যায়, তবে নাগা বাজার অঞ্চল ভবিষ্যতে “ধান ও মিঠাপানির মাছের রাজধানী” হিসেবেও পরিচিত হতে পারে।
সৌজন্যে,
নাগা বাজার,
কিনুরমোড়, কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী।
