পারিবারিক ঐতিহ্য ও গ্রামীণ উন্নয়নের অনন্য প্রতীক
নাগা বাজার::
রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার কাতিলা গ্রামের কিনুরমোড়ে আজ যে নাগা বাজার নামে পরিচিত একটি জমজমাট গ্রামীণ বাণিজ্যকেন্দ্র দেখা যায়, তার শেকড় বহু আগের পারিবারিক ইতিহাসে গাঁথা। এই বাজারের নামকরণ, প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ—সবকিছুই একদিকে যেমন স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি একটি পরিবারের ঐক্য, স্মৃতি ও অবদানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাগা বাজার নামটির জন্ম খুবই ব্যক্তিগত এবং আবেগময়। মোঃ গাহের আলী মন্ডল, জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৪০, এবং তাঁর স্ত্রী মোছাঃ নাসিমা বেগম, জন্ম ১ মে ১৯৪২, দীর্ঘ জীবনের পথচলায় তাদের পরিবারকে কেন্দ্র করেই এই নামের সূচনা। তাঁদের বিবাহ হয়েছিল ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০। পরবর্তীতে তাঁদের দুই পুত্র ও দুই কন্যার সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ১৯৯০–এর দশকে উদীয়মান বাজারটির জন্য নাম প্রস্তাব করা হয়—”না” (Nasima) থেকে “না” এবং “গা” (Gaher) থেকে “গা” মিলে “নাগা”। এই নামটি পরিবার যেমন স্নেহের সঙ্গে গ্রহণ করে, তেমনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষও নামটি মেনে নেয় এবং বাজারটি নাগা বাজার নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি নাগা বাজার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মোছাঃ নাসিমা বেগম, মোঃ গাহের আলী মন্ডল, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং আশপাশের বহু গ্রামের মানুষ। তাঁদের উপস্থিতি কেবল একটি বাজার উদ্বোধন নয়, বরং একটি পরিবারের নামকে ঘিরে গড়ে ওঠা ইতিহাস ও ভালোবাসার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল।
নাগা বাজারের ভৌগোলিক অবস্থানও এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। এটি অবস্থিত কাতিলা গ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে—একটি “L”-আকৃতির গ্রামের দুটি দিককে একত্রে যুক্ত করে। গ্রামের উত্তরাংশকে বলা হয় নিচু কাতিলা, আর পশ্চিমাংশকে বলা হয় উপর কাতিলা। এই দুটি অংশের সংযোগস্থলেই নাগা বাজার অবস্থিত। ফলে বাজারটি গ্রামের স্বাভাবিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং দ্রুতই মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার প্রধান জায়গায় পরিণত হয়।
বাজারটিকে কেন্দ্র করে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে—
নাগা বাজার– বীরকুৎসা সড়ক
নাগা বাজার–মুলিভিটা সড়ক
নাগা বাজার–ভবানীগঞ্জ সড়ক
এই তিন রাস্তা দিয়ে আশপাশের অন্তত এক ডজন গ্রামের মানুষ প্রতিদিন বাজারে আসে। বীরকুৎসা, গোপীনাথপুর, বনগ্রাম, শান্তিপুর, নক্খোপাড়া, ভাগনদী, কোলা, মাধাইমুড়ি, দুখলপাড়া, জোগীপাড়া—এসব গ্রামের মানুষের প্রধান বাণিজ্যিক ঠিকানা নাগা বাজার।
কাতিলা ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি ডাকঘর, একটি ইউনিয়ন পরিষদ, দুটি মাদ্রাসা, দুটি ঈদগাহ ময়দান, ছয়টি মসজিদ, একটি হিন্দু মন্দির এবং একটি গ্রামীণফোন টাওয়ার—যা নাগা বাজারকে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।
https://maps.app.goo.gl/ufC2qFVaQeB5hVUJ6
https://maps.app.goo.gl/A2qsmAQUGR49xVfE8
https://maps.app.goo.gl/i27cpairDTRsqGZK7
https://maps.app.goo.gl/WDC7s4cLJcW2pCW46
https://maps.app.goo.gl/HdM4ZMvE74AgCLBx9
এলাকার কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনেও নাগা বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামের দক্ষিণ ও পূর্বদিকে প্রবাহিত কাতলা খাল কৃষিকাজে পানি সরবরাহ করে এবং এলাকার উর্বরতা বাড়ায়। নিকটবর্তী কাতিলা বিল স্থানীয় মাছ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আবার নাগা বাজার সেতু কাতিলা ও গোপীনাথপুরকে যুক্ত করেছে, ফলে কৃষিপণ্য বেচাকেনা আরও সহজ হয়েছে।
নাগা বাজারের সকাল শুরু হয় কৃষকদের আনাগোনায়। আশপাশের গ্রামগুলো থেকে মানুষ ভোরে আসে তাজা সবজি, মাছ, ডিম, দুধ ইত্যাদি পণ্য নিয়ে। ক্রেতাদের ভিড়ে বাজার সরগরম থাকে। বিকেলের দিকে আবার মানুষ জমায়েত হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে। এভাবে বাজারটি ব্যবসা ও সামাজিক যোগাযোগ—দুটোরই কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
নাগা বাজারের উন্নয়ন মূলত মানুষের প্রয়োজন, পরিবারের উদ্যোগ এবং স্থানীয় সমাজের ঐক্যের ফল। একটি সাধারণ জায়গা আজ একটি পরিচিত বাজারে পরিণত হয়েছে, যার শেকড়ে রয়েছে একটি পরিবারের ইতিহাস ও স্মৃতি। নাগা বাজার আজ শুধু একটি বাজার নয়—এটি কাতিলা ও আশপাশের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
Newspaper link:
