Uncategorized

নাগা বাজারের একজন ভালো মানুষের বিদায়

নাগা বাজারের একজন ভালো মানুষের বিদায়
মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসতে পারে—এই সত্যটি আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। যিনি আমার মায়ের পেটের আপন ভাই ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন আমার গ্রামের ছোট ভাইয়ের মতো অত্যন্ত আপন একজন মানুষ। তাঁর নাম মিজানুর রহমান মিন্টু।
২০০৭ সালের কথা। একদিন হঠাৎ তাঁর ফোন পেলাম। তিনি বললেন,
“ভাই, আমি একটু ছোটখাটো ডাক্তার হতে চাই। একটি পরীক্ষায় অংশ নেব। কিছু প্রশ্নের উত্তর যদি আমাকে পাঠিয়ে দেন।”
আমি সাধ্যমতো তাঁকে প্রশ্নগুলোর উত্তর পাঠিয়ে দিলাম। পরীক্ষা শেষে আবার ফোন করলেন—
“ভাই, আমি পাশ করেছি!”
তাঁর কণ্ঠের আনন্দ আজও কানে ভাসে। মনে হয়েছিল, এই সাফল্যই ছিল তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন।
এরপর শুরু হলো তাঁর নতুন পথচলা। ছোট্ট একটি ফার্মেসি দিয়ে কর্মজীবন শুরু। প্রথমে সাইকেল, পরে মোটরসাইকেল। তাঁর বাবা ছিলেন একজন গ্রাম্য চিকিৎসক। হয়তো বাবা নিজের স্বপ্ন পূর্ণতা দিতে পারেননি, কিন্তু ছেলে মিজানুর রহমান সততা, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।
একসময় ফার্মেসির দোকানের জায়গা নিয়ে আগের মালিকের সঙ্গে সমস্যা সৃষ্টি হয়। তিনি আমার কাছে এসে সহযোগিতা চাইলেন। আমি বিষয়টি নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা, আমার বাবা মরহুম গাহের আলী মন্ডল-এর সঙ্গে আলোচনা করি। বাবা আন্তরিকভাবে সম্মতি দেন। এরপর তিনি নাগা বাজারে নতুন দোকান নেন এবং তাঁর প্রিয় মায়ের নামে ফার্মেসির নাম রাখেন “মকসেদা ফার্মেসি”। তাঁর মা মকসেদা ছিলেন তাঁর অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস।
প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত তিনি নিরলসভাবে ফার্মেসিতে রোগীদের সেবা দিতেন। তাঁর পরিশ্রম ও সততার ফলেই তাঁর উপার্জন ছিল একটি সম্মানজনক সরকারি চাকরিজীবীর আয়ের চেয়েও বেশি। তিন সন্তানের জনক হিসেবে তিনি সুন্দরভাবে পরিবার পরিচালনা করেছেন।
তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সততা, মানবিকতা, সরলতা এবং বিনয়। কখনো কারও সঙ্গে অকারণ বিরোধে জড়াতেন না। মানুষের বিপদে-আপদে সবসময় পাশে দাঁড়াতেন।
জীবনের শুরুতে তিনি গান-বাজনার খুব অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু একসময় তাঁর জীবনে এক অসাধারণ পরিবর্তন আসে। মুখে দাড়ি, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি গভীর অনুরাগ—সব মিলিয়ে তিনি একজন পরহেজগার মুসলিম হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। তাঁর শলাপরামর্শে বাড়ির সামনে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেখানে নতুন প্রজন্মকে ইসলামী শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই পরিবর্তন আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছিল।
আমার বাবা, নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম গাহের আলী মন্ডল, এবং আমার মা মোসা: নাসিমা বেগম-এর চিকিৎসাসেবায়ও তিনি সবসময় আন্তরিক ছিলেন। একজন গ্রাম্য চিকিৎসক হিসেবে তাঁর যতটুকু সামর্থ্য ছিল, তিনি তা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন।
যদিও তিনি এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন না, তবুও এলাকার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন “ডাক্তার সাহেব”। তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা, আন্তরিকতা এবং সঠিক পরামর্শের ওপর মানুষের ছিল অগাধ আস্থা। প্রয়োজন হলে তিনি রোগীদের যথাযথ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এটাই ছিল তাঁর পেশাগত সততা।
রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার ১৫ নম্বর জগিপাড়া ইউনিয়নের কাতিলা গ্রামের প্রাণকেন্দ্র নাগা বাজারে তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে নিরলসভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন। তাঁর ফার্মেসি ছিল শুধু একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল অসংখ্য মানুষের আস্থার ঠিকানা।
আজ ভোরবেলায় মিজানুর রহমান মিন্টু এই পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। তাঁর এই অকাল প্রয়াণে আমরা একজন সৎ, পরিশ্রমী, মানবিক ও ধর্মপ্রাণ মানুষকে হারালাম।
মহান আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি—তিনি যেন মরহুম মিজানুর রহমান মিন্টুকে ক্ষমা করেন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত ও নূরে পরিপূর্ণ করেন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন। আমিন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
১৯/০৭/২০২৬
Naga Bazar
Naga bazar Zero Point