Uncategorized

নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা গাহের আলী মন্ডল: পরিচিতি পর্ব – ১৫

তাঁর এই অবদান এলাকার মানুষ কখনো ভুলবে না।

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁদের জীবনের সংগ্রাম, চিন্তাধারা ও কর্ম মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। কাঁটিলা, বাগমারা, রাজশাহীর নাগা বাজার এলাকার স্বপ্নদ্রষ্টা মরহুম Gaher Ali Mondal ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনের অধিকারী, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল অসাধারণ। বহু কষ্ট, ত্যাগ ও দীর্ঘ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তিনি নাগা বাজার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পরিবার ও সমাজের জন্য চিন্তা করেছেন এবং মানুষকে ভালো কাজ করার উপদেশ দিয়ে গেছেন।

২০২৬ সালের ২২ মার্চ সকাল। তখন মরহুম গাহের আলী মন্ডলের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তিনি এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। সেই সকালে তাঁর বড় ছেলে Md. Abdul Alim এবং তাঁর দুই নাতি  and other grandson Md. Anarul Islam একসাথে তাঁকে গরম পানি দিয়ে গোসল করান। পরিবার লক্ষ্য করেছিল যে, ঠান্ডা পানি ব্যবহার করলে তাঁর শরীরে খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিত এবং তিনি অনেক বেশি কষ্ট অনুভব করতেন। তাই তাঁকে খুব যত্নের সাথে গরম পানি দিয়ে ধীরে ধীরে গোসল করানো হয়।

গোসলের পর তাঁর পুরো শরীরে তেল মালিশ করা হয়, যেন কিছুটা আরাম অনুভব করেন। কিন্তু তখনও তাঁর শরীর ছিল অত্যন্ত দুর্বল। পরিবারের সবার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে তিনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তবুও পরিবারের সদস্যরা আশা ছাড়েননি। বিশেষ করে তাঁর বড় ছেলে Md. Abdul Alim শেষ চেষ্টা হিসেবে তাঁকে স্যালাইন দেওয়ার কথা ভাবেন। পাশাপাশি নেজাল গ্যাস ও বিভিন্ন ওষুধ যেমন Orix 1 gram, Ceftriaxone, Budicort, Windel Plus এবং নেজাল ড্রপ ব্যবহার করা হয়।

তবে বাস্তবে শুধু এই চিকিৎসা যথেষ্ট ছিল না। তাঁর শরীরের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি অত্যন্ত জরুরি ছিল। তাঁকে হয়তো স্যালাইনের পাশাপাশি নিয়মিত খাবার বা টিউবের মাধ্যমে পুষ্টি দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু Md. Abdul Alim মনে করেছিলেন, আগের কয়েকবারের মতো এবারও তাঁর বাবা সুস্থ হয়ে উঠবেন। কারণ অতীতে তিনবার তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থা থেকে ফিরে এসেছিলেন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ভেবেছিলেন হয়তো আবারও অলৌকিকভাবে সুস্থতা ফিরে আসবে।

কিন্তু ভাগ্যের সিদ্ধান্ত ছিল ভিন্ন। পরে বাবার মৃত্যুর পর তিনি উপলব্ধি করেন যে তাঁর সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। এই উপলব্ধি তাঁর জীবনের একটি গভীর কষ্টের স্মৃতি হয়ে থাকে। পরিবারের অন্য সদস্যরাও মূলত বড় ছেলে Md. Abdul Alim-এর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতেন—তিনি বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন কি না, সেই বিষয়ে সবাই তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দিতেন।

গাহের আলী মন্ডলকে পরিবারের সবাই সবসময় নানা ধরনের খাবার, ফলমূল ও জুস দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি কিছুটা খাবার গ্রহণও করতেন, কিন্তু তা ছিল খুব অল্প পরিমাণে, যা তাঁর শারীরিক চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। ধীরে ধীরে তাঁর শরীর আরও ভেঙে পড়তে থাকে। পরিবারের মানুষজন তাঁর পাশে বসে থাকতেন, তাঁকে সাহস দিতেন, তাঁর কথা শুনতেন। কিন্তু সময় তখন খুব দ্রুত শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

২০২৬ সালের ২৪ মার্চ বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে এই মহান মানুষ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো নাগা বাজার এলাকার মানুষের জন্য ছিল এক গভীর শোকের মুহূর্ত। কারণ তিনি শুধু একজন পিতা ছিলেন না, ছিলেন একজন সমাজগঠক, স্বপ্নদ্রষ্টা ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একজন ব্যক্তি।

মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সন্তানদের সবসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিতেন। তিনি বলতেন—

“সবসময় এমন কথা বলবে, যা তোমাদের সমাজে শক্তিশালী ও সম্মানিত করে তোলে। মানুষের ভালো করবে, কখনো কারও ক্ষতির কথা চিন্তা করবে না।”

এই কথাগুলো ছিল তাঁর জীবনের মূল দর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের জন্য ভালো কাজই একজন মানুষকে প্রকৃত মর্যাদা দেয়। তাই তিনি সারাজীবন মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেছেন। নাগা বাজার প্রতিষ্ঠার পেছনেও ছিল মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এলাকার উন্নয়নের স্বপ্ন।

১৯৯০-এর দশক থেকেই তিনি পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন একটি আধুনিক বাজার গড়ে তোলার। তখন এলাকার বহু মানুষ বেকার ছিলেন এবং অর্থনৈতিক সুযোগ ছিল সীমিত। গাহের আলী মন্ডল উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি পরিকল্পিত বাজার গড়ে উঠলে আশেপাশের মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসবে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি ধীরে ধীরে কাজ শুরু করেন। নানা বাধা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েও তিনি থেমে যাননি। অবশেষে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করে এবং নাগা বাজার আজ একটি পরিচিত বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

তাঁর এই অবদান এলাকার মানুষ কখনো ভুলবে না। কারণ নাগা বাজার শুধু একটি বাজার নয়; এটি ছিল তাঁর স্বপ্ন, শ্রম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সমাজের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা।

বর্তমানে তাঁর দুই ছেলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে তাঁরা তাঁদের পিতার আদর্শ ও উপদেশ যতদিন সম্ভব সংরক্ষণ করবেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, গাহের আলী মন্ডলের শিক্ষা শুধু তাঁদের পরিবারের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি মূল্যবান দিকনির্দেশনা। মানুষের পাশে থাকা, সততার সাথে চলা এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করা—এই নীতিগুলোই তাঁরা ধরে রাখতে চান।

আজ গাহের আলী মন্ডল শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, তাঁর উপদেশ এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত নাগা বাজার তাঁকে মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত করে রেখেছে। তাঁর জীবনের গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখাবে যে একজন সাধারণ মানুষও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও মানবিক চিন্তাধারার মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারেন।Top of FormBottom of Form

সৌজন্যে,

নাগা বাজার,কাতিলা, বাগমারা, রাজশাহী।

https://maps.app.goo.gl/8PPoSFxTTLXCeif86

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *