নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা গাহের আলী মন্ডল: পরিচিতি পর্ব–১৬
জীবনের শেষ প্রহরে এক স্বপ্নবাজ মানুষের সংগ্রাম
নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম গাহের আলী মন্ডল ছিলেন একজন দূরদর্শী, কর্মঠ এবং সমাজসেবামূলক মানসিকতার মানুষ। দীর্ঘ জীবনের নানা সংগ্রাম, পরিশ্রম ও পরিকল্পনার মাধ্যমে তিনি নাগা বাজারকে একটি পরিচিত বাজার হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু জীবনের শেষ দিকে শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে অনেকটাই দুর্বল করে দেয়। ২০২৬ সালের ২২ মার্চের রাতটি তাঁর পরিবার ও স্বজনদের জন্য ছিল গভীর উদ্বেগ, মমতা এবং প্রার্থনার এক স্মরণীয় রাত।
সেদিন রাতের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নীরব, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ে ছিল অজানা আশঙ্কা। গাহের আলী মন্ডল শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ ছিলেন এবং বেশিরভাগ সময় শয্যাশায়ী অবস্থায় কাটাচ্ছিলেন। তাঁর বড় ছেলে মোঃ আব্দুল আলিম সারারাত তাঁর পাশে সতর্কভাবে অবস্থান করছিলেন। পরিবারের সবাই চেষ্টা করছিলেন যেন তিনি সর্বোচ্চ সেবা ও যত্ন পান। ঘরের চারপাশে পর্যাপ্ত আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে যেকোনো প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।
রাতের বিভিন্ন সময়ে তিনি জেগে উঠতেন এবং কখনো কখনো শারীরিক প্রয়োজনের কথা জানাতেন। তাঁর কষ্ট পরিবারের সদস্যদের গভীরভাবে ব্যথিত করত। তাঁর আরাম ও সুবিধার কথা চিন্তা করে দুই ছেলে মোঃ আব্দুল আলিম ও মোঃ গোলাম মোস্তফা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাবার কষ্ট যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।
গাহের আলী মন্ডলের শারীরিক অবস্থা তখন এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা বারবার চেষ্টা করলেও তিনি কোনো খাবার গ্রহণ করতে পারছিলেন না। তাঁর ছোট মেয়েও সারাক্ষণ পাশে ছিলেন এবং বাবাকে কিছু খাওয়ানোর আন্তরিক চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শারীরিক দুর্বলতার কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হচ্ছিল না। এই দৃশ্য পরিবারের সকলকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছিল।
সেদিন রাতে গাহের আলী মন্ডল বারবার একটি কথা বলছিলেন—তাঁকে যেন রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। হয়তো দীর্ঘদিনের অভ্যাস কিংবা মানসিক প্রশান্তির স্মৃতি থেকে তিনি এমন ইচ্ছা প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু তখন ছিল গভীর রাত। তাঁর এই আবদার শুনে পরিবারের সদস্যদের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল।
মোঃ আব্দুল আলীম বাবার অবস্থা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। তিনি ভাবছিলেন, প্রয়োজনে হাসপাতালে নেওয়া যেতে পারে কি না। এ বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শও করা হয়। পরিচিত চিকিৎসক ডা. মোঃ আসাদুল ইসলামের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া হলে তিনি আপাতত বাড়িতেই পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশনা দেন। সেই পরামর্শ অনুযায়ী পরিবারের সদস্যরা বাড়িতেই সর্বোচ্চ যত্ন নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যান।
একসময় যিনি এলাকার মানুষের সঙ্গে হাসি-আনন্দে মিশে থাকতেন, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতেন এবং নাগা বাজারের উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনা করতেন, সেই মানুষটিকেই তখন অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী দেখে সবাই মর্মাহত হচ্ছিলেন। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর খোঁজখবর নিচ্ছিলেন এবং দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করছিলেন।
গাহের আলী মন্ডলের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি ছিল নাগা বাজার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে তাঁর অবদান। ১৯৯০-এর দশক থেকেই তিনি একটি সুপরিকল্পিত বাজার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে মানুষের সমর্থন, নিজের পরিশ্রম এবং দূরদর্শী চিন্তার মাধ্যমে তিনি সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি বাজার গড়ে তোলা, যা শুধু কেনাবেচার কেন্দ্র হবে না, বরং এলাকার মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করবে।
বছরের পর বছর ধরে তিনি বাজারের উন্নয়ন, ব্যবসায়ীদের উৎসাহ প্রদান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির বিষয়ে চিন্তা করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলেই নাগা বাজার স্থানীয় মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তাই তাঁর অবদান শুধুমাত্র একটি বাজার প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ ছিল।
জীবনের শেষ সময়ে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও তাঁর স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং উপদেশ পরিবারের কাছে অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়ে যায়। তাঁর দুই ছেলে মোঃ আব্দুল আলীম ও মোঃ গোলাম মোস্তফা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে তাঁদের পিতার আদর্শ, পরামর্শ এবং উন্নয়নের স্বপ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা উচিত। তাঁরা নাগা বাজারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় এবং এর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।
আজ গাহের আলী মন্ডল আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, কর্ম এবং অবদান নাগা বাজারের প্রতিটি পথ, প্রতিটি দোকান এবং প্রতিটি মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোর এই স্মৃতি শুধু একটি পরিবারের আবেগের গল্প নয়, বরং একজন স্বপ্নবাজ মানুষের জীবনসংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং সমাজের জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারের এক মূল্যবান দলিল।