Uncategorized

নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা:সময়ের স্রোত থেমে থাকে না, কিন্তু ভালো মানুষের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না।

নাগা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত গাহের আলী মণ্ডল: একটি স্বপ্ন, একটি বাজার এবং মানুষের কল্যাণের ইতিহাস

প্রয়াত গাহের আলী মণ্ডল ছিলেন নাগা বাজার এলাকার একজন পরিচিত, পরিশ্রমী ও স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস। আজকের নাগা বাজারের বিকাশের পেছনে তাঁর স্বপ্ন, উদ্যোগ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

গাহের আলী মণ্ডল ১ জানুয়ারি ১৯৪০ সালে রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার কাতিলা গ্রামের নাগা বাজার এলাকায় একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রয়াত কসির আলী মণ্ডল এবং মাতা ছিলেন প্রয়াত উপজান বিবি। সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল অসাধারণ। জীবনের শুরু থেকেই তিনি গ্রামের মানুষের জীবন, তাদের প্রয়োজন এবং এলাকার উন্নয়নের সম্ভাবনা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।

একটি সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি খুব কাছ থেকে গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ দেখেছেন। তিনি বুঝতেন, শুধু কৃষির ওপর নির্ভর করে এলাকার সব মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে বেকার যুবক ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ব্যবসা ও ছোট উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এই উপলব্ধি থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর মনে একটি বাজার গড়ে তোলার স্বপ্ন জন্ম নেয়।

১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর উদ্যোগ ও চিন্তাধারাকে কেন্দ্র করে বর্তমান নাগা বাজারের যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে এটি ছিল একটি ছোট এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা স্থানীয় বাজার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়তে থাকে এবং আশপাশের এলাকার মানুষ এখানে আসা-যাওয়া শুরু করেন। গাহের আলী মণ্ডলের স্বপ্ন ছিল এমন একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য সহজে কিনতে পারবেন এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সময় এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। বিশেষ করে ২০১০-এর দশকে নাগা বাজারের কার্যক্রম ও ব্যবসায়িক পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। আশপাশের এলাকার অনেক মানুষ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন। ছোট দোকান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষিপণ্য, মাছ, সবজি এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। যে উদ্যোগ একসময় একটি স্বপ্ন হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীতে বহু মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

বেকার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজতে থাকা মানুষের জন্য এই বাজারের বিকাশ ছিল এক ধরনের আশীর্বাদ। অনেক মানুষ ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পান। কেউ দোকান দেন, কেউ পণ্য বিক্রি করেন, কেউ পরিবহন বা অন্যান্য সেবামূলক কাজে যুক্ত হন। এভাবেই নাগা বাজার শুধু একটি কেনাবেচার স্থান নয়, বরং এলাকার মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়।

গাহের আলী মণ্ডলের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল পরিবারকেন্দ্রিক। তিনি রেখে গেছেন তাঁর প্রিয় স্ত্রী মোছাঃ নাসিমা বেগমকে। তাঁদের দুই ছেলে—মোঃ আব্দুল আলীম ও মোঃ গোলাম মোস্তফা এবং দুই মেয়ে—মোছাঃ সুরজাহান বিবি ও মোছাঃ আকলিমা বেগম। তিনি তাঁর সন্তান ও পরিবারের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তাঁর পরিবার ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান শক্তি।

তিনি তাঁর নাতিদের প্রতিও অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তাঁর প্রিয় নাতিদের মধ্যে রয়েছেন মোঃ শাদমান শাবাব এবং মোঃ মিনহাজ। পরিবারের নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ভালোবাসা ও স্নেহে পূর্ণ। জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও এলাকার মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন।

২০২৬ সালের ২৪ মার্চ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে প্রয়াত গাহের আলী মণ্ডল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু ছিল পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং নাগা বাজার এলাকার মানুষের জন্য অত্যন্ত আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক। তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়ার সংবাদে সবাই গভীরভাবে শোকাহত হয়ে পড়েন। নাগা বাজারের অনেক মানুষ এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না যে এই স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষটি এত দ্রুত তাঁদের ছেড়ে চলে গেলেন।

তবে তাঁর জীবনের শেষ সময়ের একটি বিষয় পরিবারকে বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়—তিনি ছিলেন একজন সৌভাগ্যবান মানুষ। ঈদের ছুটির সময় পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি মৃত্যুর আগে তাঁর আপনজনদের দেখতে পেরেছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্তের আগে পরিবারের মানুষ, সন্তান, নাতি-নাতনি ও প্রিয়জনদের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি গভীর আবেগের স্মৃতি হয়ে থাকবে।

আজ ২৪ আগস্ট ২০২৬, তাঁর মৃত্যুর পাঁচ মাস পূর্ণ হলো। মনে হয়, এই তো সেদিন তিনি আমাদের মাঝে ছিলেন; কিন্তু দেখতে দেখতে পাঁচটি মাস চলে গেল। সময় সত্যিই কারও জন্য অপেক্ষা করে না। মানুষ পৃথিবীতে আসে, নিজের কর্মের মাধ্যমে পরিচিতি তৈরি করে এবং একদিন সবাইকে ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্মের মাধ্যমে মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। গাহের আলী মণ্ডল তেমনই একজন মানুষ।

তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা বিকাশের পথে এগিয়ে দেওয়া নাগা বাজার। একটি বাজার শুধু দোকানপাট ও কেনাবেচার জায়গা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্বপ্ন, পরিশ্রম, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। নাগা বাজারের প্রতিটি উন্নয়ন, প্রতিটি নতুন ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তাঁর সেই প্রাথমিক স্বপ্ন ও উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।

একজন মানুষ তাঁর জীবদ্দশায় কতটুকু সম্পদ রেখে গেলেন, সেটিই তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয়। বরং তিনি মানুষের জন্য কী করেছেন, সমাজের জন্য কী রেখে গেছেন এবং কত মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন—সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গাহের আলী মণ্ডল নাগা বাজার এলাকার মানুষের জন্য এমন একটি উদ্যোগের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত করে গেছেন, যা আগামী প্রজন্মের কাছেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তাঁর চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্নেহময় স্বামী ও পিতা; নাতিদের কাছে একজন ভালোবাসার দাদা; আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে ছিলেন আপনজন; আর নাগা বাজার এলাকার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ও পথপ্রদর্শক।

তাঁর জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—ছোট একটি উদ্যোগও একদিন অনেক মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একটি ভালো চিন্তা, আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং মানুষের কল্যাণের ইচ্ছা সময়ের সঙ্গে একটি বৃহৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

আজ তাঁর মৃত্যুর পাঁচ মাস পূর্ণ হওয়ার এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রয়াত গাহের আলী মণ্ডলকে স্মরণ করছি। তাঁর জীবনের কর্ম, স্বপ্ন এবং মানুষের কল্যাণে রেখে যাওয়া অবদান নাগা বাজারের ইতিহাসের সঙ্গে চিরকাল যুক্ত থাকবে।

সময়ের স্রোত থেমে থাকে না, কিন্তু ভালো মানুষের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না।

আমরা মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করি—
আল্লাহ যেন প্রয়াত গাহের আলী মণ্ডলকে তাঁর সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত ও নূরে ভরে দেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। আমিন।